শ্রীলঙ্কা ভ্রমণে যা দেখলাম..!


উপমহাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ একটি দেশ শ্রীলঙ্কা। আমার শ্রীলঙ্কা যাত্রা ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে। সদ্য অর্থনৈতিকভাবে দেউলিয়া হওয়া দেশটি ভ্রমণের আগ্রহ অনেক আগ থেকেই ছিলো, এটি ছিলো আমার ২য় দেশ ভ্রমণ, ঢাকা থেকে শ্রীলঙ্কায় যাওয়া-আসার বিমান ভাড়া ৬০ হাজার টাকার বেশী হওয়ায় আমি এক ভিন্ন পথ বেছে নেই। ভারতের ভিসা থাকায় বাই-রোডে কলকাতা গিয়ে ৩ দিন ঘুরে-ফিরে সেখান থেকে জীবনের প্রথম দীর্ঘ ২৬ ঘন্টার রোমাঞ্চকর  ট্রেন জার্নি শেষে পৌঁছাই চেন্নাই সেন্ট্রাল রেলওয়ে স্টেশন। ট্রেনটি ছিলো করমন্ডল এক্সপ্রেস আর ভাড়া পড়লো ৪ হাজার টাকা, যা ৩ টায়ার স্লিপার সিট। চেন্নাই শহরে একদিন অবস্থান করে পূর্বে বুকিং করা শ্রীলঙ্কান এয়ারলাইনসের টিকিট, চেন্নাই টু শ্রীলঙ্কা  টু ঢাকা এবং ভাড়া পড়লো ২০ হাজার টাকা। আর শ্রীলঙ্কার ই টি এ এপ্রুভাল আগেই করে ফেলি, খরচ ২৪শ টাকা। কলম্বো এয়ারপোর্টে নেমেই সহজ ইমিগ্রেশন সম্পূর্ণ করলাম। যদিও আমি সলো ট্রাভেলার হওয়ায় মনে কিছুটা ভয় কাজ করছিলো। তারপর এয়ারপোর্টে ডায়ালগ এর সিম কার্ড কিনে বের হলাম। এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে হঠাৎ মনে একটা ভয় ডুকে পড়লো। একা মানুষ কোথায় চলে আসলাম। তারপর সবাই কে জিজ্ঞেস করে মেইন রাস্তায় উঠে একটা টুকটুক ৩০০ রুপিতে ভাড়া করে ২ কিলো পথ পেরিয়ে চলে এলাম কাটুনায়েক বাসস্ট্যান্ডে। এসি করা মিনিবাসে চড়ে প্রায় ২ঘন্টায় চলে এলাম কলম্বো বাসস্ট্যান্ডে, ভাড়া ৩২০ রুপি। বাসস্ট্যান্ডে নেমে মানুষকে জিজ্ঞেস করে কিছুদূর পায়ে হেঁটে চলে এলাম কলম্বো ফোর্ট রেলওয়ে স্টেশনে এটি শতবর্ষ পুরনো একটি স্টেশন, ৫০০ রুপিতে ২য় ক্লাসের টিকিট করি গলের উদ্দেশ্যে যাত্রা করার জন্য। প্রচন্ড রোদের তাপ আর ক্লান্ত শরীর নিয়ে উঠে পড়লাম ট্রেনে। কোন সিট ফাঁকা নেই, দাঁড়িয়েই রওনা হলাম। ১০ মিনিট চলার পর সাগরের কোল ঘেঁষে ট্রেন যাত্রার দৃশ্য আর স্বচ্ছ নীল জলের ঢেউের পানি রেললাইন কে কোমল স্পর্শ করার অপরুপ চিত্র আমার সব ক্লান্তি মুচে গেলো। মনেহলো এটিই জীবনের শ্রেষ্ঠ স্মৃতিময়ী ট্রেন যাত্রা। ৬ ঘন্টার চোখজুড়ানো জার্নি শেষে চলে এলাম গন্তব্যে। স্টেশনে নেমেই হোটেলের উদ্দেশ্যে পায়ে হেঁটে রওয়া হলাম। জিপিএস লোকেশন মতো হোটেলের কাছে পৌছানোর পর হোটেল খুঁজে পাচ্ছিনা। পড়লাম মহা বিড়ম্বনায়।

কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর অন্য আরেকটি হোটেল থেকে ম্যাসেজ করলো এবং সেখানে চলে গেলাম। কিছুটা গ্রামের দৃশ্য তবে ডুপ্লেক্স বাড়িটি দারুণ ছিলো। ৩ হাজার রুপিতে ১ রাত থাকার সিদ্ধান্ত করি। হোটেলের নাম কোকোয়া গেস্ট হাউজ। তারপর বেরিয়ে পড়লাম গল সিটি দেখার জন্য প্রথমেই চলে গেলাম গল ফোর্টে। ডাচদের তৈরী ফোর্ট টির বয়স প্রায় ৪শ বছর, হোটেল রেস্তোরাঁ, মসজিদ, গির্জা এবং বিনোদনের সবই রয়েছে। তারপাশেই গল স্টেডিয়াম। চারদিকে সন্ধা নেমে আসছে, গলফোর্ট থেকে সমুদ্র কে দেখা কি অপরুপ, চোখ জুড়ানো দৃশ্য। রক্তিম সূর্য পশ্চিমাকাশে হেলে পড়ছে। কিছুসময় হাঁটাহাটি করার পর সন্ধা এবং পরে রাত নেমে এলো।  সাগরের গর্জন উঁচু উঁচু ঢেউ আর ঠান্ডা বাতাস। অন্যদিকে আাকাশে ঝলমলে চাঁদের আলো। এই অনুভূতিটা প্রকাশ করার ভাষা নেই। অনেকে ভাঙ্গা গলায় গিটারের বাজনায় গানের সুর তুলছে আবার কেউকেউ দারু গিলিতেছে। সব শেষে হোটেলে এসে পরদিন সকালে চলে গেলাম উনাওয়াটুনা বিচ দেখতে।৷ এরই মধ্যে শ্রীলঙ্কার লোকাল খাবার খেলাম। বেশ সুস্বাদু। খাবারে ঝাল আর নারকেলের ব্যবহার চোখে পড়ার মত। বাসে করে ৪০ রুপিতে চলে গেলাম উনাওয়াটুনা বিচের কাছাকাছি এবং পায়ে হেঁটে বিচে পৌছেইতো অবাক। সাগরের বড়বড় ঢেউ আর লাল বালির সৈকত। পশ্চিমা সংস্কৃতির পর্যটকই বেশি,  বিকিনি পড়ে খোলামেলা যায়গায় বসে রৌদ্রস্নান করতেছে। কিছুসময় পর লোকাল বাসে চলে গেলাম মিরিসাতে। শ্রীলঙ্কার ব্যপারে একটা বিষয় লক্ষনীয় ছিলো, তাদের আকৃতি আর জীবনাচরণ অনেকটাই বাঙ্গালীদের মত। আমাকে দেখে সবাই ভেবেছে আমি শ্রীলঙ্কান। কাউকে বিশ্বাস করাতে পারছিলামনা আমি যে বাঙ্গালী।  শ্রীলঙ্কার অবকাঠামো উন্নয়ন দেখে মনেই হয়নাই এটি এশিয়ার কোন দেশ। সুশৃঙ্খল আর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাস্তাঘাট। তারপর মিরিসাতে আসার পর ম্যাংগো স্যাড গেস্ট হাউজে ৩ হাজার রুপিতে দুই দিনের জন্য উঠি। মিরিসার বিচগুলো অত্যন্ত চমৎকার।  কোকোনাট হিল, টার টাল বিচ সবই দেখেছি। এখানকার মানুষগুলো অত্যন্ত ভদ্র। দুইদিন পর বাসে করে চলে গেলাম কলম্বো। শহর থেকে কমদামে কিছু চা পাতা আর মসলা কিনে নিগম্বতে চলে আসি। এয়ারপোর্টের কাছাকাছি এয়ারপোর্ট লেওভার বি এন্ড বি নামের দোতলা একটা গেস্ট হাউসে একদিন থাকি। এখানকার সাধারণ মানুষগুলোর সাথে মেশার চেষ্টা করি। তাদের বাড়িঘর গুলো কিছুটা ইউরোপীয় স্টাইলের। সাধারণ মানুষেরা খুব সহজসরল। পরদিন সকালে শ্রীলঙ্কান এয়ারলাইনসে চড়ে চলে এলাম ঢাকাতে। এরমধ্যেই সম্পূর্ণ করলাম ৫ দিনের সফর।

ধন্যবাদ।

টি এম নাছির উদ্দিন

YouTube Channel Link






Post a Comment

advertise
advertise
advertise
advertise